ঐক্যফ্রন্টের নিষ্ফল বৈঠক, সিদ্ধান্তে অটল কাদের সিদ্দিকী

দীর্ঘদিন পর বৈঠক ডেকেও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। জোটের দুই শীর্ষ নেতা গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন এবং নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার অনুপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে নিজেদের ভেতরকার মান-অভিমান এবং দূরত্ব কমিয়ে আনার উদ্যোগ খুব একটা কাজে আসেনি।

সোমবার বিকালে রাজধানীর উত্তরায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল- জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রবের বাসায় এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

সরকার বিরোধী আন্দোলনসহ ভবিষ্যতে একসঙ্গে পথ চলার কর্মকৌশলও ঠিক করতে পারেনি তারা।

জোটের আরেক শরিক বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের দেয়া আলটিমেটাম ইস্যুতেও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি এই বৈঠকে।

এ অবস্থায় জোটের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেনের উপস্থিতিতে আবারও বৈঠকে বসার সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে শেষ হয় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠক।

মূলত নির্বাচন পরবর্তী সময়ে নানা ইস্যুতে জোটের ভেতরে তৈরি হওয়া দূরত্ব, মান অভিমান এবং টানাপোড়েন দূর করে নতুন করে পথ চলার লক্ষ্য নিয়েই আয়োজন করা হয় এই বৈঠকের। কিন্তু জোটের দুই শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন এবং মাহমুদুর রহমান মান্না এতে অংশ নেননি।

তাদের এই অনুপস্থিতি নিয়ে বৈঠকের শুরুতেই প্রশ্ন তোলেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী। এ সময় উপস্থিত গণফোরাম এবং নাগরিক ঐক্যের নেতারা জানান, তারা ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কারণে উপস্থিত থাকতে পারেননি। পরবর্তী বৈঠকে অংশ নেবেন। এরপর শুরু হয় নানা ইস্যুতে দীর্ঘ আলোচনা।

দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টার বৈঠক শেষে গণমাধ্যমকর্মীদের ব্রিফ করেন আসম আবদুর রব।

তিনি বলেন, ঐক্যফ্রন্টের ঐক্য থাকবে। প্রয়োজনে এই জোটের পরিধি আরও বাড়ানো হবে। তিনি বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ কারারুদ্ধ সব নেতাকর্মীর মুক্তি ও জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধভাবে রাজপথে লড়াই করে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।

আ স ম রব বলেন, ‘আমরা জাতির কাছে অঙ্গীকার ও ওয়াদাবদ্ধ। ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে জাতির কাছে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও আইনের শাসন প্রবর্তনের মাধ্যমে জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠা, রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনার প্রতিশ্রুতিতে আমরা নির্বাচনে গিয়েছিলাম। এটা আমরা এখনো আদায় করতে পারি নাই। আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন ও ঐক্য অব্যাহত থাকবে’।

তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে রাষ্ট্রীয়ভাবে ভোট ডাকাতি হয়েছে, এর পরিপ্রেক্ষিতে আপনাদের প্রশ্ন থাকতে পারে, এই প্রশ্নের উত্তর আজকে আমরা দেব না। আমাদের নেতা ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে বৈঠক করার পর এ প্রশ্নের উত্তর দেব’।

আ স ম রব বলেন, ‘উন্নয়নের নামে রাষ্ট্রীয় সম্পদের হরিলুট চলছে। একটা বালিশের দাম ছয় হাজার টাকা। পৃথিবীতে এমন ইতিহাস আছে? এই অবস্থায় সরকারের বিরুদ্ধে প্রবল আন্দোলন গড়ে তুলতে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। এজন্য আমাদের নেতা ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে আগামীতে সভায় বসব। এই আন্দোলনের রূপ হবে ঐক্যবদ্ধ; বৃহত্তর ঐক্য। ঐক্যফ্রন্টের ঐক্য আরও বিস্তৃত করতে হবে।

এ লক্ষ্যে স্বাধীনতার পক্ষে সরকার বিরোধী আরও যত রাজনৈতিক দল আছে, সবাইকে নিয়ে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে জনগণের গণতন্ত্র মুক্ত করব’।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ছাড়তে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর দেয়া চিঠির বিষয়ে জেএসডি সভাপতি বলেন, ‘বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া কারাগারে, বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে বোমা পাওয়া গেছে। হাজার হাজার নেতা-কর্মী কারাগারে, লাখ লাখ মামলা। তাদের কারাগারে রেখে আমারা রাতে ঘুমাতে পারি না। আমরা কথা দিচ্ছি, তাদের বের করার আগ পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। আমাদের শরিক দলের মধ্যে কে কী কথা বললো, সেটা বড় কথা নয়। জনগণের জন্য এই ঐক্য অব্যাহত থাকবে’।

তিনি বলেন, ‘ড. কামাল হোসেন অসুস্থ। তিনি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তাদের সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখবেন; তার উপস্থিতিতে আলোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে’।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বৈঠকের শুরুতেই নির্বাচন পরবর্তী সময়ে জোটের কর্মকাণ্ড এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে নানান অসঙ্গতী তুলে ধরেন আ স ম আবদুর রব।

তিনি বলেন, অনেক ভুল-ত্রুটি আছে। এটা স্বীকার করতে হবে। এই ভুল-ত্রুটি শুধরে এক সঙ্গে পথ চলতে হবে। প্রায় পনেরো মিনিট নানান ইস্যুতে কথা বলেন আ স ম আবদুর রব।

তার বক্তব্যের পর অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরীর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ নেয়ার বিষয়টি উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, ‘শপথ নেয়া না নেয়া নিয়ে এত নাটকীয়তার প্রয়োজনীয়তা ছিল না। এতে আমাদের ভাবমুর্তি ক্ষুন্ন হয়েছে। আটজন জয়ী হল। শপথ নিল সাতজন। মির্জা ফখরুল ইসলাম কেনো শপথ নিলেন না। যদিও এটা তিনি ভালো বলতে পারবেন। তিনি হয়তো বলবেন দলের সিদ্ধান্তে শপথ নেননি। মানুষতো আর তা বুঝবে না। বুঝতে চাইবে না’।

এ অবস্থায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আলোচনায় অংশ নেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের মধ্যে কিছুটা ভুল বোঝাবুঝি আছে, নানা কারণে এটা হয়েছে। নির্বাচনের পর আমাদের বসা উচিত ছিল। আরও আলাপ আলোচনা করা প্রয়োজন ছিল। আলাপ-আলোচনা যে হয়নি, তা কিন্তু নয়। তবে এটা ঠিক বৃহত্তর স্বার্থেই আমরা শপথ নিয়েছি। আর দলের সিদ্ধান্তেই আমি শপথ নেইনি। কেউ কেউ এ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন। কিন্তু বিকল্প কী ছিল আমাদের হাতে? শপথ না নিলে সরকার আরও ফাঁকা মাঠে গোল দিত। আমাদের কিছুই করার থাকত না’।

তিনি আরও বলেন, ‘দেশকে রক্ষায় আমাদের ঐক্য সুসংহত করতে হবে। জোটের পরিধি বাড়াতে হবে। ধারাবাহিক কর্মসূচি দিয়ে মাঠে থাকতে হবে। সরকারের অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করতে হবে। এজন্য সবার আগে প্রয়োজন নিজেদের মধ্যে মান-অভিমান দূর করা। রাজনীতিতে মান অভিমান চলে না। যেহেতু একসঙ্গে যাত্রা শুরু করেছি, চলেন সবাই মিলে দেখি এর শেষ কোথায়’।

এ সময় বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেন, ‘এখানে মান অভিমান নয়। এখানে জনআস্থার বিষয়টি জড়িত। একেক সময় একেক কথা আর একেক রকম সিদ্ধান্ত নিলে মানুষের কাছে মুখ দেখানো যায় না’।

তিনি বলেন, ‘আমি আমার কথা লিখিতভাবে জানিয়েছি। আমি সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা চাই। অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় রাজনীতি করা যায় না। এই রাজনীতি আমি করিও না। আমি সোজাসাপ্টা মানুষ। আমি কম বুঝি। আপনাদের মতো আমার এত বুদ্ধিও নাই’।

কাদের সিদ্দিকী আরও বলেন, রাজনীতি করতে হলে জনগণের মনের ভাষা বুঝতে হবে। অবস্থান পরিষ্কার থাকতে হবে। বিএনপিকে তার অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে’।

কাদের সিদ্দিকীর এই বক্তব্যের পর আ স ম আবদুর রব বলেন, ‘আমরা আবার বসব। প্রয়োজনে ড. কামাল হোসেনের উপস্থিতিতেই এ নিয়ে আরও আলোচনা করব। কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার, দেশের মানুষ এই সরকারের বিরুদ্ধে। আমরা আমাদের রাজনীতি ঠিক করে এগুতে পারলে, ঠিকমতো মাঠে নামতে পারলে- সরকার বাধ্য হবে পিছু’ হটতে’।

গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে নিজেদের এমপিদের শপথ না নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এই সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রথমে গণফোরামের দুজন এমপি শপথ নেন। তখন এ দুইজনের কড়া সমালোচনা করেন বিএনপি নেতারা।

পরে শপথ নেওয়ার সময়সীমা শেষ হওয়ার আগ মুহূর্তে বিএনপি থেকে নির্বাচিত পাঁচজন সংসদ সদস্য শপথ নেন। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গত ৯ মে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী জানিয়ে দেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে সাতজনের শপথ গ্রহণের সঠিক ব্যাখ্যা দিতে না পারলে ৮ জুন ফ্রন্ট ছেড়ে দেবে তার দল।

সেদিনের সংবাদ সম্মেলনে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ সভাপতি বলেন, ‘আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, আগামী এক মাসের মধ্যে যে যে অসঙ্গতি আছে, তা সঠিকভাবে নিরসন না হলে ৮ জুন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেবে’।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল- জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব, সহ-সভাপতি তানিয়া রব, সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন, জেএসডির কেন্দ্রীয় নেতা শহিদ উদ্দীন আল মাহমুদ স্বপন, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, সাধারণ সম্পাদক হাবীবুর রহমান তালুকদার, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ইকবাল সিদ্দিকী, গণফোরাম নির্বাহী সভাপতি অধ্যাপক আবু সাইয়্যিদ, অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক ড. রেজা কিবরিয়া, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফর উল্লাহ চৌধুরী, নাগরিক ঐক্যের কেন্দ্রীয় নেতা ডা. জাহেদ উর রহমান, মমিনুল ইসলাম, বিকল্প ধারার একাংশের সভাপতি অধ্যাপক নুরুল আমীন বেপারী, মহাসচিব অ্যাডভোকেট শাহ আহমেদ বাদল প্রমুখ।