তোমার কাছে জীবনে কিছুই চাই না, একটা ইনজেকশন দাও বাবা

নরসিংদী সদর উপজেলার হাজিপুরে শ্বশুরবাড়ির লোকদের দেয়া আগুনে দগ্ধ হয়ে প্রায় ৪০ দিন পর অবশেষে না-ফেরার দেশে চলে গেছেন গৃহবধূ জান্নাতি আক্তার (১৮)। গত ৩০ মে (বৃহস্পতিবার) ভোরে ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

এর আগে গত ২১ এপ্রিল যৌতুকের টাকার জন্য ঘুমন্ত অবস্থায় শ্বশুরবাড়ির লোকদের দেয়া আগুনে দগ্ধ হয় গৃহবধূ জান্নাতি। এ ঘটনার পৌনে দুই মাস পার হলেও থানায় মামলা হয়নি।

পরে আদালতে মামলা করলেও তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়নি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। থানায় মামলা না হওয়ায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন স্কুলছাত্রীর হত্যাকারীরা। সেই সঙ্গে খুনিদের অব্যাহত হুমকির মুখে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন নিহত স্কুলছাত্রীর পরিবারের সদস্যরা। খুনিরা প্রভাবশালী হওয়ায় এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন।

এদিকে আদরের সন্তানকে হারিয়ে পাগলপ্রায় জান্নাতির পরিবার। খুনিদের গ্রেফতারে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ তুলেছে নিহতের পরিবার।

মাদক ব্যবসায় সহযোগিতা না করায় ২১ এপ্রিল রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় নরসিংদীর হাজিপুরের দশম শ্রেণির ছাত্রী জান্নাতি আক্তারের (১৬) গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেন স্বামী শিপলু, শাশুড়ি ও ননদ।

পুলিশ ও নিহতের পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রায় এক বছর আগে নরসিংদী সদর উপজেলার হাজিপুর গ্রামের শরীফুল ইসলাম খানের মেয়ে জান্নাতি আক্তারের সঙ্গে খাচেরচর গ্রামের হুমায়ুন মিয়ার ছেলে শিপলু মিয়ার প্রেম হয়।

কিছুদিন পর পরিবারের অমতে পালিয়ে বিয়ে করেন তারা। বিয়ের কিছুদিন যেতে না যেতেই স্বামীর আসল রূপ বেরিয়ে আসে। গৃহবধূ জান্নাতিকে মাদক ব্যবসায় সম্পৃক্ত করতে শাশুড়ি শান্তি বেগম ও স্বামী শিপলু চাপ প্রয়োগ করেন।

এতে রাজি হননি জান্নাতি। তার ওপর নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন। এরপর শ্বশুরবাড়ির লোকজনের পক্ষ থেকে পাঁচ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করা হয়। জান্নাতির দরিদ্র পরিবার যৌতুকের দাবি পূরণ করতে পারেনি।

ফলে জান্নাতির ওপর নেমে আসে ভয়াবহ নির্যাতন। যৌতুকের টাকা না দেয়াসহ মাদক ব্যবসায় জড়িত না হওয়ায় ২১ এপ্রিল রাতে স্বামী শিপলু, শাশুড়ি শান্তি বেগম ও তার মেয়ে ফাল্গুনী বেগম ঘুমন্ত অবস্থায় জান্নাতির শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেন। দগ্ধ হয়ে ছটফট করলেও তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাননি তারা। পরে এলাকাবাসীর চাপে জান্নাতিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। দীর্ঘ ৪০ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে ৩০ মে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জান্নাতির মৃত্যু হয়।

নিহত জান্নাতির বাবা শরীফুল ইসলাম খান বলেন, মেয়ের শরীরে আগুন দেয়ার পরপরই থানায় মামলা করতে যাই। কিন্তু পুলিশ মামলা নেয়নি। পরে আদালতে মামলা করি। আদালত থেকে পিবিআইকে মামলাটি তদন্তের নির্দেশ দিলেও তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেনি।

শরীফুল ইসলাম খান আরও বলেন, এ অবস্থায় খুনিরা আমাদের পরিবারকে ভয়ভীতি ও হুমকি দিচ্ছে। মামলা করলে আমার ছোট মেয়েকে তুলে নিয়ে যাবে। একই সঙ্গে আমাদের সবাইকে মেরে ফেলা হবে বলে হুমকি দেয় তারা।

নিহত জান্নাতির মা হাজেরা বেগম বলেন, মেয়েটাকে ফুসলিয়ে নিয়ে যায় তারা। যখন ভুল বুঝতে পেরেছে তখন মেয়ে আমাদের বাড়ি চলে আসে। কিন্তু শ্বশুরবাড়ির লোকজন জোর করে তাকে নিয়ে যায়। আমরা গরিব, তাই বাধা দিয়ে রাখতে পারিনি। জান্নাতির শ্বশুরবাড়ির লোকজন চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী। তারা পুলিশ ও আইনকে তোয়াক্কা করে না। তাদের বিরুদ্ধে ১০-১২টি মামলা আছে। পুলিশের সঙ্গে সখ্য আছে তাদের। তাই আমাদের মামলা নেয়নি পুলিশ।

অবশ্য মৃত্যুর আগে আগুন দিয়ে পোড়ানোর ঘটনার বর্ণনা দিয়ে গেছেন জান্নাতি। তার বর্ণনায় কেঁপে উঠেছিল সবার বুক। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন পাশের বেডে থাকা এক রোগী জান্নাতির ভয়ঙ্কর বর্ণনার ভিডিও ধারণ করেছেন।

ছবি: সংগৃহীত
ভিডিওতে দেখা যায়, মৃত্যুর যন্ত্রণায় ছটফট করছেন জান্নাতি। তীব্র ব্যথা সইতে না পেরে বাবার কাছে ব্যথানাশক একটি ইনজেকশন দেয়ার দাবি জানান। জান্নাতি বলেছিল তোমার কাছে জীবনে আর কিছুই চাইব না বাবা। একটা ব্যথানাশক ইনজেকশন দাও। কিন্তু দরিদ্র বাবা ওই ইনজেকশন কিনে দিতে পারেননি। ভুল বুঝতে পেরে নিজের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চেয়ে গেছেন জান্নাতি।

জান্নাতির বাবা শরীফুল ইসলাম খান বলেন, মৃত্যুর আগে মেয়ে যে ইনজেকশন চেয়েছিল তার দাম সাত হাজার টাকা। আরেকটির দাম ৩ হাজার ৮০০ টাকা। আমি দরিদ্র মানুষ, চা বিক্রেতা। এত টাকা কোথায় পাব। তাই মেয়ের শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে পারিনি। ধারদেনা ও ঋণ নিয়ে যতদিন ওষুধ দিতে পেরেছি ততদিন বেঁচে ছিল জান্নাতি। এরপর আর মেয়েকে বাঁচাতে পারিনি। এখন শুধু একটাই দাবি, মেয়ের হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই।

বাদীপক্ষের আইনজীবী ফয়সাল সরকার বলেন, ফেনীর নুসরাত হত্যাকাণ্ডের মতো নরসিংদীতে জান্নাতি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। অথচ চাঞ্চল্যকর জান্নাতি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা নেয়নি পুলিশ। বাধ্য হয়ে আদালতে যাই। আদালত সাতদিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বললেও পিবিআই ও পুলিশ তা দেয়নি। তাই মামলার কার্যক্রমে বিলম্ব হচ্ছে। আসামিদের গ্রেফতার করেনি পুলিশ।

নরসিংদীর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পুলিশ সুপার এআরএম আলিব বলেন, সিআর মামলা তদন্ত করতে একটু সময় লাগে। তার ওপর এটি হত্যা মামলা। ঘটনাটি অনেক বড়। তাই স্বচ্ছ ও ঘটনার সঠিক চিত্র তুলে আনতে সময় লাগছে। ইতোমধ্যে প্রাথমিক তদন্তে জান্নাতির গায়ে আগুন দেয়া ও পরে হত্যার ঘটনার সত্যতা পেয়েছি আমরা। আরও কিছু বিষয় আছে, সেগুলো শেষ হলে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হবে।

আসামিদের গ্রেফতারের বিষয়ে পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার এআরএম আলিব বলেন, সিআর মামলায় পিবিআইয়ের হাতে আসামি গ্রেফতারের বিধান নেই। তবে আদালত ওয়ারেন্ট জারি করলে আসামিকে গ্রেফতার করতে পারি আমরা।