আমার বৈশাখ

adminadmin
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  01:01 AM, 15 April 2020

আমাদের গ্রামের নাম মুকসেদপুর। ঢাকা জেলার দোহার থানায় এ গ্রাম। ওখানেই বেড়ে উঠেছি। আমাদের গ্রামে ছোটবেলায় বৈশাখী মেলা হতো না। কিন্তু খুব উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে হালখাতা হতো। গ্রামে কাছাকাছি দুটি বাজার ছিল—নারিশা বাজার আর মুকসেদপুর বাজার। বাজারের দোকানে দোকানে যেতাম। বসতাম। বাকি না থাকলেও কিছু টাকা দিতে হতো। এরপর রসগোল্লা, ছানার আমৃতি, মিষ্টি, লুচি, দই, খই, মুড়ি, চিঁড়া ভেজানো খাবার খেতে দিত।

কলেজবেলা

কলেজে পড়ার সময় আমি মানিকগঞ্জ শহরে। এটা ১৯৯১ কি ১৯৯২ সালের কথা। ওইখানে তখন উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িয়ে পড়লাম। সেখান থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করতাম আমরা। ওই শোভাযাত্রার একটা বড় দায়িত্ব আমার ওপরে ছিল। বন্ধুবান্ধব ও উদীচীর সদস্যদের নিয়ে শোভাযাত্রার নানা অনুষঙ্গ বানাতাম। সেগুলোয় সমসাময়িক ঘটনাগুলো তুলে ধরতে চাইতাম। সঙ সাজানোর দিকেও আগ্রহ ছিল। একবারের ঘটনা মনে পড়ে। একাত্তরের যিশু নামে নাসির উদ্দিন ইউসুফের একটা সিনেমা আছে। ওই কনসেপ্ট নিয়ে একবার আমার এক বন্ধুকে সাজালাম। বাঁশসহ আরো নানা কিছুর মধ্যে ভ্যানের ওপর অনেকক্ষণ থাকতে হয়েছিল তাঁকে। ব্যাপারটি তাঁর জন্য ভীষণ কষ্টদায়ক ছিল। তখন তো আর অতকিছু বুঝি না, অল্প বয়স, আবেগের আতিশয্য বেশি।

এবারই বুঝি

সম্ভবত এই বছরটাতেই শুধু বৈশাখের কাজ করতে গেলাম না। চারুকলা থেকে বের হওয়ার পরও প্রতিবছর পহেলা বৈশাখের কাজ করার চেষ্টা করেছি। যখন ছাত্র ছিলাম, তখন তো চৈত্রের শেষ ১০টি দিন আমাদের বাড়িঘর, খাওয়া-পরা, ঘুমানো—সবই ছিল চারুকলায়। মঙ্গল শোভাযাত্রার জন্য জিনিসপত্র তৈরি করাই ছিল ধ্যান-জ্ঞান। ২৪ ঘণ্টাই সেখানে কেটে যেত। সময়টা ভালোই কাটত। চারুকলায় ধরেন আমাদের একেকটা ক্লাস ছিল মিনিমাম ৫ ঘণ্টা। ক্লাস শেষেও বেশির ভাগ সময় কাজের ভেতরেই থাকতাম। এ জন্য সুযোগ পেলেই খুব আনন্দ-ফুর্তি করতাম। আমি জুনিয়র তখন। এক বড়ভাই হয়তো বললেন, এই স্ট্রাকচারটা বানাইয়া দে তো বা এই তারটা একটু গরম করে নিয়ে আয়। আমরা আগুন জ্বালিয়ে গরম করে নিয়ে গেলাম। পরে সেই ভাই বললেন, এই এটা তো বেশি গরম হয়ে গেছে। ঠাণ্ডা করে আনতে হবে। আবার গেলাম ঠাণ্ডা করার জন্য। তৎক্ষণাৎ হয়তো বিরক্তি লাগত। কিন্তু এটায় একটা মজা ছিল। এভাবে সিনিয়র-জুনিয়রের মধ্যে সখ্য গড়ে ওঠে পহেলা বৈশাখের কাজের সময়। এখনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হলে এগুলো নিয়ে হাসাহাসি করি—‘তুই তো এভাবে ধরাটা খাইছিলি।’ আমাদের শিক্ষার একটা বড় জায়গা ছিল এই বৈশাখের কাজকর্ম। ক্লাসে শিক্ষকের কাছে আমরা হয়তো আঁকাটা শিখেছি। কিন্তু বাস্তবে সেটা করার একটা বড় সুযোগ ছিল এই বৈশাখ। চারুকলায় পড়ার খরচ তো তুলনামূলক কিছু বেশি। যেটা আমাদের অনেকের মা-বাবার পক্ষেই জোগান দেওয়া কষ্টকর। ফলে আমাদের নিজেদের খরচ নিজেদেরই জোগাড় করতে হতো। আমরা যারা পহেলা বৈশাখের কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম তারা অন্যান্য কাজে তুলনামূলক বেশি পারদর্শী হতাম। এ রকম একটা পরিবেশে কাজ করার কারণে আর ওই অভিজ্ঞতার কারণে আমি বাইরে কাজ করতে পারতাম তখন। ওটা দিয়ে পরে পড়াশোনার খরচ জোগানোর সুযোগও মিলত।

একটা সুবিধা বটে

চারুকলার একটা সুবিধা হলো, এখানে ওইভাবে ছোট-বড় নাই। আমার আরো ২০ বছর আগে যিনি পাস করে গেছেন, তিনিও আসেন পহেলা বৈশাখের মতো উৎসবকে কেন্দ্র করে। এভাবে অনেক প্রথিতযশা শিল্পীর সঙ্গে একটা সম্পর্ক তৈরি হয়, তাঁদের কাছাকাছি যাওয়া যায়। তখন তাঁদের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখা যায়। ফ্যাশনের কথাই যদি বলেন, ধরেন আমার এই শাড়ি তৈরি করা, কাপড় নিয়ে হরেক রকম নিরীক্ষা, এটা পেলাম শিল্পী তরুণ ঘোষের কাছ থেকে।

এবারই সব অন্য রকম। এমন বৈশাখ আর আসেনি, এমন বৈশাখ আর না আসুক। আমাদের চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মী, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, জরুরি পণ্য সরবরাহকারী মানুষগুলো লড়ছে। এখন তাঁদের অনুপ্রাণিত করা জরুরি। এখন ঘরে বসে থাকব—এটাই সমাজের জন্য একটা কাজ। সংক্রমণ বাড়ার ঝুঁকি আছে—এমন কিছু চিন্তাই করা যাবে না।
অনুলিখন : পিন্টু রঞ্জন অর্ক

আপনার মতামত লিখুন :